JanaBD.ComLoginSign Up

যে রেকর্ড ভাঙবে না কখনোই

ক্রিকেট দুনিয়া 31st Jul 2016 at 7:07pm 750
যে রেকর্ড ভাঙবে না কখনোই

জিম লেকার, দশ উইকেট নিয়ে ফিরে আসছেন গর্বিত ভঙ্গিতে।

ব্র্যাডম্যান শেষ টেস্ট খেলেছেন ৫৮ বছর আগে। ৯৯.৯৪-এর হুমকির মুখে পড়া দূরে থাক, টেস্ট ক্রিকেটে পরের সেরা ব্যাটিং গড় এর ৩০ রানের মধ্যেই যেতে পারেনি। কমপক্ষে ২ হাজার রান করেছেন, এমন ব্যাটসম্যানদের মধ্যে ব্যাটিং গড়ের রেকর্ডে ব্র্যাডম্যানের পরের নামটি দক্ষিণ আফ্রিকান বাঁহাতি ব্যাটসম্যান গ্রায়েম পোলকের। তা ৬০.৯৭। ৬০-ছাড়ানো গড়ই আছে আর মাত্র দুজনের। ‘ব্ল্যাক ব্র্যাডম্যান’ খ্যাত জর্জ হেডলির (৬০.৮৩) আর ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ওপেনিং জুটিতে জ্যাক হবসের পার্টনার হার্বার্ট সাটক্লিফের (৬০.৭৩)

জিম লেকারের ১৯ উইকেট নেওয়ার কীর্তিরও ৬০ বছর পূর্তি হলো আজ। এক ইনিংসের ১০ উইকেটই না নিলে এক টেস্টে ১৯ উইকেট পাওয়া সম্ভব নয়। লেকার ১০ উইকেট নিয়েছিলেন দ্বিতীয় ইনিংসে। ৪৩ বছর পর জিম লেকারের এই ‘অল টেন’ কীর্তির পুনরাবৃত্তি করেন ভারতীয় লেগ স্পিনার অনিল কুম্বলে। তবে এক টেস্টে ১৯ উইকেটের রেকর্ড কখনোই হুমকির মুখে পড়েনি। লেকারের রেকর্ডের পর দুই ইনিংস মিলিয়ে ১৬ উইকেটের বেশি পাননি কেউই। যে তিনজন ১৬ উইকেট পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে দুজন টেস্ট অভিষেকেই। ১৯৭২ সালে লর্ডসে অস্ট্রেলিয়ান পেসার বব ম্যাসি ১৬ উইকেট নিয়েছিলেন ১৩৭ রানে। ১৫ বছর পর ভারতীয় লেগ স্পিনার নরেন্দ্র হিরওয়ানি ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মাদ্রাজে ১৬ উইকেটই নেন, তবে ১ রান কম খরচ করে। ১৬ উইকেট আছে শ্রীলঙ্কান অফ স্পিনার মুত্তিয়া মুরালিধরনেরও। ১৯৯৮ সালে ওভালে ইংল্যান্ডের ১৬ উইকেট নিতে তাঁর খরচ হয়েছিল ২২০ রান।

জিম লেকারের পর এক টেস্টে সবচেয়ে বেশি উইকেট নেওয়ার রেকর্ডটি অবশ্য এঁদের নয়। ১৯১৩-১৪ মৌসুমে জোহানেসবার্গে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ১৭ উইকেট নিয়েছিলেন সিডনি বার্নস। যার ২৭ টেস্টে ১৬.৪৩ গড়ে ১৮৯ উইকেট ব্র্যাডম্যানের ৯৯.৯৪ আর লেকারের ১৯ উইকেটের মতোই টেস্ট ক্রিকেটের আরেক বিস্ময়।

১৯৫৬ সালের ওল্ড ট্রাফোর্ড টেস্ট, যেটিকে ‘লেকারের টেস্ট’ বলাই ভালো, শুরু হয়েছিল ২৬ জুলাই। লেকার তাঁর ১৯ উইকেটের শেষ ৮টি নিয়েছিলেন ৩১ জুলাই, টেস্টের শেষ দিনে। টেস্ট দূরে থাক, ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটেও তো আর কোনো বোলারের এক ম্যাচে ১৯ উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব নেই। এতটাই অবিশ্বাস্য কীর্তি ছিল তাঁর। বিস্ময় হয়ে আছে এখনো।

প্রথম ইনিংসে লেকার নিয়েছিলেন ৩৭ রানে ৯ উইকেট, দ্বিতীয় ইনিংসে ৫৩ রানে ১০। ম্যাচে ১৯ উইকেট নিলে ২০তম উইকেটটির প্রত্যাশা থাকতেই পারে। লেকারের ছিল না। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের তৃতীয় উইকেটটিই শুধু লেকারের হাতছাড়া হয়েছিল, তখন তো তাঁর কল্পনা করারও কথা নয় যে, এরপর এই ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার সব উইকেটটিই হবে তাঁর।

আরও বেশি কল্পনাতীত ছিল লেকারের অমন সাফল্যের মধ্যে তার স্পিন পার্টনার বাঁহাতি টনি লকের ওই একটি উইকেটই সম্বল হয়ে থাকা! ওল্ড ট্রাফোর্ড টেস্টের দশ বছর পর ইংল্যান্ড থেকে প্রকাশিত ‘দ্য ক্রিকেটার’ পত্রিকায় নিজের কীর্তি নিয়ে জিম লেকার নিজেই একটা লেখা লিখেছিলেন। যার শেষটা ছিল এ রকম, ‘পেছন ফিরে তাকালে আমার সবচেয়ে বেশি বিস্ময় লাগে আমি ১৯ উইকেট পেয়েছিলাম বলে নয়, বরং টনি ১ উইকেট পেয়েছিল, এটা ভেবে।’

‘লেকারের টেস্ট’-এর ইংল্যান্ড দলের মাত্র দুজন বেঁচে আছেন এখনো। পিটার রিচার্ডসন ও অ্যালান ওকম্যান। সংখ্যাটা তিন থেকে দুই করে দিয়ে ২০১১ সালে চলে গিয়েছেন ট্রেভর বেইলি। তবে ২০০৬ সালে লেকারের এই কীর্তির ৫০ বছর পূর্তিতে দারুণ ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন বেইলি, ‘লেকার যত বেশি উইকেট পাচ্ছিল, লক সাফল্যের জন্য আরও উদ্‌গ্রীব হয়ে উঠছিল, আরও জোরে বল করছিল। আর জিম শুধু জায়গামতো বল ফেলে যাচ্ছিল।’

প্রথম ইনিংসে লেকার বল করেছিলেন ১৬.৪ ওভার, লক ১৪। দ্বিতীয় ইনিংসে বেশি বল করেছিলেন লকই (লেকার ৫১.২ ওভার, লক ৫৫)। যে ম্যাচে লেকারের বোলিং ফিগার ৬৮-২৭-৯০-১৯, তাতেই লকের নামের পাশে ৬৯-৩৩-১০৭-১! অথচ ৪৯ টেস্টে ১৭৪ উইকেটের ক্যারিয়ার-রেকর্ডই বলে দেয়, টনি লকও বোলার হিসেবে খুব খারাপ ছিলেন না। ওই টেস্টের কয়েক বছর পর লক নিজেও ‘অন্য প্রান্তে লেকারের একের পর এক উইকেট পাওয়া আর তাতে ক্রমশই উত্তেজিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠাটা’কেই ব্যর্থতার কারণ হিসেবে দেখিয়েছিলেন।

যেসব সমালোচক ওল্ড ট্রাফোর্ডের উইকেটের কথা বলে লেকারের কৃতিত্বকে খাটো করতে চান, লকের ব্যর্থতা তাঁদের জন্যও জবাব। ইংল্যান্ডের ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ পত্রিকায় সে টেস্টের ম্যাচ রিপোর্টেই প্রয়াত ই ডব্লু সোয়ানটন লিখেছিলেন, ‘যদি উইকেট ব্যাটসম্যানের জন্য কবরস্থানই হতো, তাহলে লক তাঁর সেরা ফর্মে না থেকেও, এমনকি তাঁর অন্য হাত শরীরের সঙ্গে বাঁধা অবস্থাতেও এক উইকেটের বেশি পেত।’ তারপরও ছিদ্রান্বেষীরা লেকারের কীর্তিতে উইকেটের ‘কালিমা’ ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। জীবদ্দশাতে এ নিয়ে বিরক্তিও প্রকাশ করে গেছেন লেকার।

এটা সত্যি, তখন উইকেট ঢেকে রাখার নিয়ম ছিল না। সেটি লেকারের উপকারেও এসেছিল (তবে লকও তো ওই একই উইকেটে বল করেছেন)। শেষ দিনে বৃষ্টির কারণে খেলা বন্ধ হওয়ার আগে উইকেট ছিল পুরোপুরি ব্যাটিং-স্বর্গ। হঠাৎ​ই তা বদলে যায়। লেকারের লেখা থেকেই তুলে দিই, ‘লাঞ্চের পর হঠাৎ​ করেই বেরিয়ে এল সূর্য এবং ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই জেগে উঠল উইকেট। আমরাও উইকেট পেতে শুরু করলাম।’

‘আমরা’ শব্দটা বিনয়বশত। ‘ওদের’ তো আউট করেছেন লেকার একাই। ৩ উইকেটে ৬৪ থেকে মাত্র ৮৪ রানে অলআউট হয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। মাত্র ২২ বলে ৮ রান দিয়ে শেষ ৮টি উইকেট নেন লেকার। অমন এক কীর্তির পর উদ্‌যাপনটা বিশালই হওয়ার কথা। অথচ কী হয়েছিল জানেন! নিজে বাড়ি ফেরার পথে একটি পাবে বসে পনিরের স্যান্ডউইচ ও বিয়ার খেতে খেতে একা একাই তা ‘উদ্‌যাপন’ করেছিলেন লেকার। তাঁকে কেউ বিরক্তও করেনি!

তখন অন্য সময়। অন্য যুগ। যুগে যুগে সবই বদলায়। শুধু জিম লেকারের এক টেস্টে ১৯ উইকেট নেওয়ার কীর্তিটা একই রকম অবিস্মরণীয় থেকে যায়।

তথ্যসূত্রঃ প্রথম আলো

Googleplus Pint
Like - Dislike Votes 3 - Rating 3.3 of 10
Relatedআরও দেখুনঅন্যান্য ক্যাটাগরি

পাঠকের মন্তব্য (0)