JanaBD.ComLoginSign Up

মহানবী (সা.)-এর জীবনে কোরবানি…

ইসলামিক শিক্ষা 10th Sep 16 at 7:47am 630
মহানবী (সা.)-এর জীবনে কোরবানি…

রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করার পর কোরবানির বিধান অবতীর্ণ হয়। কোরবানি নতুন কোনো বিষয় নয়। এর ধারাবাহিকতা আদম (আ.)-এর যুগ থেকেই চালু হয়েছে। আল কোরআনে কাবিল ও হাবিলের কোরবানির কথা এসেছে। তাঁদের দুজনের কোরবানি থেকে হাবিলের কোরবানি কবুল হয়েছিল। আর মুসলিম সমাজের কোরবানি মিল্লাতে ইব্রাহিমের অনুসরণ। তাঁর স্মৃতি ধারণের জন্য এ উম্মতের ওপর কোরবানি ওয়াজিব করে দেওয়া হয়েছে। মহানবী (সা.) কোরবানির অনেক মর্যাদা বর্ণনা করেছেন। সাহাবায়ে কেরাম রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! কোরবানি প্রথাটা কী?’ রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘এটা তোমাদের পিতা ইব্রাহিম (আ.)-এর সুন্নত।’ সাহাবায়ে কেরাম পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! এতে আমাদের কী লাভ রয়েছে?’ রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘কোরবানির পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি পাওয়া যাবে।’ সাহাবায়ে কেরাম পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! সওফ তথা দুম্বা, ভেড়া ও উটের পশমের বিনিময়ে কি এ পরিমাণ সওয়াব পাওয়া যাবে?’ রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘হ্যাঁ, প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি দেওয়া হবে।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩১২৭)

রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতিবছরই কোরবানি করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনার ১০ বছর জীবনের প্রতিবছরই কোরবানি করেছেন।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৫০৭)

তিনি ঈদগাহেই কোরবানির পশু জবেহ করতেন। আর তিনি উট, গরু ও ভেড়া—সবই কোরবানি করতেন। এ ক্ষেত্রে তিনি নিজেই জবেহ করতেন। প্রখ্যাত তাবেয়ি হজরত নাফে (রহ.) ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদগাহে (কোরবানির পশু) জবেহ করতেন ও নাহর (উটের কোরবানি) করতেন। (বুখারি, হাদিস : ৫৫৫২)

লক্ষণীয় যে আরবি পরিভাষা মতে, ‘জবেহ’ হয় গরু, মহিষ, ভেড়া, দুম্বা ও ছাগলের ক্ষেত্রে। আর ‘নহর’ হয় উটের ক্ষেত্রে। মহানবী (সা.) সাধারণত প্রতিবছর দুটি ভেড়া জবেহ করতেন। একটি নিজের জন্য, অন্যটি উম্মতের জন্য। হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবী করিম (সা.) দুটি ভেড়া কোরবানি দিতেন। আর আমি দুটি ভেড়া কোরবানি দিতাম।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৫৫৩)

অন্য হাদিসে এসেছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন কোরবানি করতে ইচ্ছা করতেন, তিনি চিত্রবিচিত্র, শিংবিশিষ্ট, মোটাতাজা দুটি খাসি-ভেড়া কোরবানি দিতেন। এর একটি তিনি ওই সব উম্মতের জন্য কোরবানি করতেন, যারা আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য দেবে ও তাঁর দায়িত্ব পালনের কথা স্বীকার করবে। অন্যটি তিনি নিজের ও তাঁর পরিবারের নামে জবেহ করতেন।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩১২২)

এ হাদিসের ব্যাখ্যায় জালালুদ্দিন সুয়ুতি (রহ.) বলেন, ‘এর আলোকে বোঝা যায়, নিজের কোরবানির মধ্যে পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত। এটা তাদের পক্ষ থেকে আদায় হবে। বেশিরভাগ আলেম তা-ই বলেছেন। কিন্তু আবু ইমাম হানিফা ও ছওরি (রহ.) তা মাকরুহ বলেন। (তাঁদের মতে, ওয়াজিব কোরবানিতে পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা বৈধ নয়)। ইমাম তাহাবি (রহ.) বলেন, একটি ছাগল দুজনের পক্ষ থেকে বৈধ নয়। তিনি উল্লিখিত বিধানকে রহিত বলেন।’ (আশ শামাইলুশ শরিফাহ : ১/৩২৯)

আমরা মনে করি, রহিত বলার দরকার নেই। কেননা রাসুলের কোরবানি নফল ছিল। তিনি তো সম্পদ জমা রাখতেন না। তাই তিনি নিসাবের মালিক থাকতেন না। তাঁর ওপর জাকাত ফরজ ছিল না। তিনি নফল সদকা করতেন, তেমনি তাঁর কোরবানি নফল ছিল। আর নফল কোরবানিতে একাধিক ব্যক্তির নিয়ত করা যায়। কেননা তাতে কোরবানি দাতার জন্য হয় আর পুণ্য সবার জন্য পৌঁছে যায়। নফল কোরবানির জন্য অনুমতিও লাগে না। কারো নামে ওয়াজিব কোরবানি করার জন্য অনুমতি লাগে। বিদায় হজেও মহানবী (সা.) দুটি ভেড়া জবেহ করেছেন। এক হাদিসে এসেছে : ‘অতঃপর (বিদায় হজের ভাষণের পর) তিনি চিত্রবিচিত্র দুটি ভেড়া নিলেন ও তা জবেহ করলেন। একটি ছাগলের পাল তিনি সাহাবাদের মধ্যে বণ্টন করেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৬৭৯)

হজের সময় তিনি তাঁর স্ত্রীদের জন্য কোরবানি করেছেন। সেটা ছিল তাঁদের অনুমতিবিহীন। কেননা তা নফল কোরবানি ছিল। আর নফল কোরবানির জন্য অনুমতি লাগে না। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, “আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে জিলকদের ২৫ তারিখে বের হলাম, তখন আমরা হজের নিয়ত করেছি। যখন আমরা মক্কার কাছে গেলাম তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের মধ্যে যারা ‘হাদি’র প্রাণী আনেনি, তাদের ইহরাম খুলে ফেলার নির্দেশ দিলেন। তখন আমাদের মধ্যে কোরবানির দিন গরুর গোশত বিতরণ করা হলো। আমি (বাহককে) বললাম, এটা কী? বাহক বলল, রাসুলুল্লাহ (সা.) বিবিদের পক্ষ থেকে গরু কোরবানি করেছেন।” (বুখারি, হাদিস : ১৭০৯)

বিদায় হজে মহানবী (সা.) ‘দমে শোকর’ হিসেবে ১০০টি উট কোরবানি করেছেন। ৬৩টি উট তিনি নিজে জবেহ করেছেন আর বাকিগুলো হজরত আলী (রা.) জবেহ করেছেন। হজরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘নবী (সা.) একটি উট হাদি দিলেন। আর জবেহতে এক-তৃতীয়াংশে আলী (রা.)-কে শরিক করলেন।’ (ত্বহাবি, হাদিস : ৬২৩৬)

মহানবী (সা.) তাঁর কোরবানি থেকে নিজেও খেতেন, পরিবারকেও আহার করাতেন, গরিব ও আত্মীয়স্বজনকেও আহার করাতেন। বিখ্যাত হাদিসগ্রন্থ আবু দাউদের ব্যাখ্যাগ্রন্থ আউনুল মাবুদে এসেছে—‘মহানবী (সা.)-এর নিয়মিত অভ্যাস ছিল কোরবানির গোশত তিনি নিজে খেতেন, পরিবারকে আহার করাতেন ও মিসকিনদের মধ্যে সদকা করতেন আর তিনি উম্মতকেও তার নির্দেশ দিয়েছেন।’ (আউনুল মাবুদ, খণ্ড ৭, পৃ.৩৪৫)

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর পরিবারকে কোরবানির এক-তৃতীয়াংশ আহার করাতেন, প্রতিবেশীদের এক-তৃতীয়াংশ আহার করাতেন আর ভিক্ষুকদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ সদকা করতেন।’ (মুগনি, খণ্ড ৯, পৃ. ৪৪৯)

এসব বর্ণনার আলোকে ফুকাহায়ে কেরাম বলেন, কোরবানির গোশত তিন ভাগ করা মুস্তাহাব। এক ভাগ নিজের ও নিজের পরিবারের জন্য, আরেক ভাগ আত্মীয়স্বজনের জন্য, আরেক ভাগ গরিবদের জন্য। তবে কারো পরিবারের সদস্য বেশি হলে সবটুকু গোশত রেখে দিলেও কোনো ক্ষতি হবে না।

কোরবানির জন্তু—উট, গরু, মহিষ, দুম্বা, ভেড়া ও ছাগল দ্বারা কোরবানি করা জায়েজ। অন্যান্য জন্তু দ্বারা কোরবানি নাজায়েজ। ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে এক বছর পূর্ণ হতে হবে, গরু-মহিষ দুই বছর পূর্ণ হতে হবে, উট পাঁচ বছর পূর্ণ হতে হবে। (হিদায়া, খণ্ড ৪, পৃ. ১০৩)

সাধারণত যেসব পশু দামি তা-ই উত্তম। দামে সমান হলে যে পশুর গোশত বেশি তা উত্তম। তাতেও সমান হলে যে পশুর গোশত ভালো তা উত্তম। নিতাফ ফিল ফতওয়া কিতাবে এসেছে—‘সবচেয়ে উত্তম হলো উট কোরবানি, অতঃপর গরু (ও মহিষ), অতঃপর ভেড়া (ও দুম্বা), অতঃপর ছাগল। আর উট, গরু (ও মহিষ)-এ সাতজন শরিক হতে পারে, ভেড়া (ও দুম্বা) ও ছাগলে একজনই করতে পারে।’ (নিতাফ ফিল ফতওয়া, খণ্ড ১, পৃ. ২৩৮)।

এর আলোকে বোঝা যায়, কোরবানিতে উট উত্তম, অতঃপর গরু-মহিষ, অতঃপর ভেড়া-দুম্বা, অতঃপর ছাগল, অতঃপর উট, গরু-মহিষের এক অংশ।

আর দুম্বায় মাদির চেয়ে নর উত্তম। ছাগলের মধ্যে ছাগি উত্তম, ছাগির চেয়ে খাসি উত্তম। উট ও গরুর মধ্যে মূল্য সমপরিমাণ হলে মাদিই উত্তম।

কোরবানি একটি মহৎ কাজ। এর মাধ্যমে মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা যায়। হাদিসের ভাষ্য মতে, কোরবানির জন্তু পুলসিরাতের বাহন হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) হিজরত করার পর প্রতিবছর কোরবানি দিতেন। নফল হিসেবে তিনি উম্মতকেও তাতে শরিক করতেন। আমাদের উচিত, মহানবী (সা.) যেভাবে কোরবানি আদায় করেছেন, সেভাবে কোরবানি আদায় করা।

Googleplus Pint
Like - Dislike Votes 21 - Rating 7.6 of 10
Relatedআরও দেখুনঅন্যান্য ক্যাটাগরি
ঈদে বা জুমার নামাজ একা পড়া যায় কি? ঈদে বা জুমার নামাজ একা পড়া যায় কি?
09 Jan 2018 at 9:34am 715
ধূমপান করলে কি অজু নষ্ট হয়? ধূমপান করলে কি অজু নষ্ট হয়?
01 Jan 2018 at 12:58pm 999
সন্তানকে কতদিন পর্যন্ত বুকের দুধ খাওয়ানো যায়? সন্তানকে কতদিন পর্যন্ত বুকের দুধ খাওয়ানো যায়?
25th Dec 17 at 2:55pm 1,378
কোরআন খতম করালে মৃত ব্যক্তি কি সেই সওয়াব পান? কোরআন খতম করালে মৃত ব্যক্তি কি সেই সওয়াব পান?
20th Dec 17 at 2:56pm 1,498
মোবাইল ব্যাংকিং কি সুদের আওতায় পড়ে? মোবাইল ব্যাংকিং কি সুদের আওতায় পড়ে?
17th Dec 17 at 8:01pm 1,063
পরীক্ষায় নকল করে চাকরি পেলে উপার্জন কি বৈধ হবে? পরীক্ষায় নকল করে চাকরি পেলে উপার্জন কি বৈধ হবে?
17th Dec 17 at 9:18am 1,438
মৃত ব্যক্তির কবরে মাটি দিলে কী হয়? মৃত ব্যক্তির কবরে মাটি দিলে কী হয়?
12th Dec 17 at 9:40am 1,336
ক্যামেরায় ছবি তোলা কি জায়েজ? ক্যামেরায় ছবি তোলা কি জায়েজ?
12th Dec 17 at 9:39am 1,519

পাঠকের মন্তব্য (0)

Recent Posts আরও দেখুন
নির্ভীক বিজয়-মোস্তাফিজে আত্মবিশ্বাসী মাশরাফিনির্ভীক বিজয়-মোস্তাফিজে আত্মবিশ্বাসী মাশরাফি
টাইগার শ্রফের নায়িকা ‘মিস ওয়ার্ল্ড’ মানশিটাইগার শ্রফের নায়িকা ‘মিস ওয়ার্ল্ড’ মানশি
ফের বিয়ে করতে পারেন হৃত্বিক-সুজান!ফের বিয়ে করতে পারেন হৃত্বিক-সুজান!
স্ত্রীর দাফনে এসে স্বামী যা করলেন...ধিক!স্ত্রীর দাফনে এসে স্বামী যা করলেন...ধিক!
জুটিবদ্ধ হচ্ছেন প্রভাস-দীপিকাজুটিবদ্ধ হচ্ছেন প্রভাস-দীপিকা
আইসিসির বর্ষসেরা টেস্ট ও ওয়ানডে একাদশ ঘোষনাআইসিসির বর্ষসেরা টেস্ট ও ওয়ানডে একাদশ ঘোষনা
ব্রণ দূর করবে কলার খোসার ৭ ফেসপ্যাকব্রণ দূর করবে কলার খোসার ৭ ফেসপ্যাক
মধ্যম বাজেটে দুর্দান্ত ফিচারের স্মার্টফোন আনল হুয়াওয়েই অনারমধ্যম বাজেটে দুর্দান্ত ফিচারের স্মার্টফোন আনল হুয়াওয়েই অনার