JanaBD.ComLoginSign Up

প্রেম ও আমি...

ভালোবাসার গল্প Sep 10 at 11:12pm 2,008
প্রেম ও আমি...

‘তাহলে আপনিই শিহাব?’ নিজের নাম শুনে মাথা তুলে তাকালাম। দেখি, সুন্দর মুখের একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে সামনে। হাতে সাদা রঙের মুঠোফোন। তাতে লেগে আছে শরীরে মাখানো পারফিউমের মিষ্টি একটা গন্ধ। গন্ধ শুঁকে চট করে পেয়ারাগাছের কথা মনে পড়ে গেল। ছোটবেলায় যখন বৃষ্টির দিনে পেয়ারাগাছে উঠে বসে থাকতাম, তখন এমনই একটা গন্ধ পেতাম নাকে। তাতে কত চেনা স্মৃতি মিশে আছে আমার! ছবিতে যেমন দেখেছিলাম, অবিকল সে রকম দেখতে।

সেই চোখ, সেই ভ্রু, সেই নাক। আর সেই আঁকাবাঁকা মাড়ির দাঁতগুলো পর্যন্ত একই।

বসা অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়ালাম। কী বলব সেটা মনে মনে সাজানোর চেষ্টা করছি।

মাথার ভেতর নদীর স্রোতের মতো হাজার হাজার শব্দ কোথা থেকে উড়ে এসে জানি উঁকি দিচ্ছে। কিছুক্ষণ আগে অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন দিয়ে কেউ একজন জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কই আপনি?’ এর পরপরই এই ঘটনা। কোনটা রেখে কোনটা বলি। হঠাৎ তাল হারিয়ে ফেললাম। বললাম, ‘শ্রাবণী?’

‘হুম্। চিনতে কষ্ট হচ্ছে আপনার? ছবির সঙ্গে কোনো ফারাক আছে নাকি? থাকলে বলেন। ’ কেমন ফটফট করে বলে গেল সে। হালকা বাতাসে তার চুলগুলো মৃদু মৃদু উড়ছে। জিহ্বা দিয়ে সে পাতলা ঠোঁট দুটো ভিজিয়ে নিল।

‘না না, তা হবে কেন? বসো। ’ পাশে জায়গা করে দিয়ে বসে পড়লাম। সেও বসল, তবে খানিকটা তফাতে। একটা নীল রঙের জামার সঙ্গে সাদা ওড়না পরেছে। মাথায় গোলাপি রঙের হেয়ারব্যান্ড। ফরসা মুখটাতে যেন দিনের সূর্য প্রতিফলিত হয়ে ফেরত যাচ্ছে দূরে, গালে এমন একটা ঝিলিক দেখতে পেলাম। মুগ্ধ নয়নে তার পানে একবার তাকিয়ে মাটিতে মুখ করে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভালো আছ?’

বুকে কেমন একটা দুরুদুরু ভয় কাজ করছিল, যার জন্য সহজ হতে পারছিলাম না। বহু মেয়ের সঙ্গে আগে তো প্রথম দেখাতেই অনেক কথা বলেছি। কই, তখন তো এমন হয়নি। আর এখন যার সঙ্গে আলাপের তিন মাস হয়ে গেছে, তেমন একজনের সঙ্গে কথা বলতে সংকোচবোধ হচ্ছে আমার। নিজের প্রতি ধিক্কার চলে এলো। পিঠ সোজা করে বসলাম। আচমকা সারা শরীরে পিঁপড়ার কামড়ের মতো জ্বালা শুরু হলো। জল না পেয়ে কয়েক দিনের তৃষ্ণার্ত চামড়াটা বিদ্রোহ করার পাঁয়তারা করেছে বোধ হয়। রৌদ্র-অ্যালার্জিটা এই জাগল বলে!

প্রশ্নটা শোনার পর উত্তর না দিয়ে শ্রাবণী বলল, ‘তার আগে মাথাটা এদিকে দেন আপনার, গুনে গুনে চারটা চুল ছিঁড়ি। তারপর যা বলার বলবেন। ’

‘চুল ছিঁড়বে মানে?’ চমকে উঠলাম। তা-ও আবার চারটা? মুখটা হাঁ হয়ে গেছে। বলে কী মেয়েটা? মগের মুল্লুক পেয়েছে নাকি! মনে মনে ভাবলাম।

আমার এমন ভাব দেখেই কিনা কে জানে, শ্রাবণী চোখ দুটো গোল গোল করে বলল, ‘এত সহজেই ভুলে গেছেন। দুই দিন পর তো আমাকেও মনে থাকবে না। ’ তারপর মুখটা গোমড়া করে চুপ মেরে গেল। কপট একটা অনুভূতি খেলা করছে তার পটলচেরা চোখ দুটোতে।

ঘটনার শুরু আজ থেকে তিন মাস আগে। দুপুরবেলার এক অবসরে বসে ফেসবুক চালাচ্ছিলাম কিছুদিন আগে কেনা পুরনো স্মার্টফোনে। হঠাৎ সাজেস্ট ফ্রেন্ডে একজোড়া চোখ দেখে থমকে গেলাম। এর আগে এমন চোখ যে দেখিনি, তা নয়।

যাদের দেখেছি, তারা সবাই কারো না কারো সঙ্গে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

এই শঙ্কাটা মনে ছিল, তবু অজানা এক আগ্রহে তার আইডিতে উঁকি দিলাম। আমার বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্রী। এ বছর ভর্তি হয়েছে। কী সুন্দর মুখ তার! দেখে মনে হয়, এই বুঝি দুধ দিয়ে ধুয়ে দিয়েছে কেউ। এমন কাঁচা রং। ওর চোখ দুটো স্বাভাবিকের চেয়ে বড়। এত বড় চোখের মায়াতে পড়েই গেলাম শেষ পর্যন্ত। দোলাচলে দুলতে দুলতে কপালে যা আছে বলে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দিলাম। আর অপেক্ষা করতে লাগলাম।

আনুমানিক দুই ঘণ্টা পর যখন আবার ফেসবুকে ঢুকলাম, তখন দেখলাম অ্যাকসেপ্ট করার নোটিফিকেশনটা চলে এসেছে। মনটা খুশিতে নেচে উঠল। আর দেরি না করে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই তাকে মেসেজে নক করলাম। উত্তরও পেলাম কিছুক্ষণ পর। এমনি করেই আলাপচারিতা চলতে লাগল আমাদের। অনেক বিষয় নিয়েই কথা হচ্ছিল। প্রসঙ্গটা ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত বিষয়ের দিকে গড়িয়ে গেল। স্বীকার করতে দোষ নেই, তাতে পরোক্ষ ভূমিকাটা একতরফা আমারই ছিল।

তখন দেখি ও মেসেজ দেখেও উত্তর দিতে খানিকটা সময় নিতে শুরু করল। ভাবলাম, এই বুঝি ফসকে গেল অল্পের জন্য।

প্রবলভাবে হারানোর ভয়ে ভীত হয়ে উঠলাম। একপর্যায়ে লজ্জার মাথা খেয়ে জানতে চাইলাম ওর বয়ফ্রেন্ডের পোস্টটা খালি আছে কি না। সে তো হেসেই খুন। বলল, এমনভাবে কেউ কখনো জিজ্ঞেস করেনি। তাই উত্তরও তার জানা নেই এবং প্রেম নিয়ে সে সিরিয়াস নয়। তবে হাবভাবে যা বুঝলাম তাতে মনের সবুজ বাতিটা না জ্বেলে পারল না। এবার তাকে বললাম, দরখাস্ত দিতে হলে হাতে লিখে দিতে হবে, না টাইপ করতে হবে?

সে কোনো উত্তর করল না। সেদিনের মতো সে উধাও হয়ে গেল। কয়েক দিন কোনো খোঁজ ছিল না তার। গুম হয়ে যাওয়া বলতে যা বোঝায়, একেবারে আক্ষরিক অর্থে তা-ই। এর মাঝে আমি তাকে যে মেসেজ করিনি, তা নয়। উত্তর না পেয়েও বার্তার পর বার্তা দিয়ে গেছি এই ভেবে যে যদি কখনো সংকেত আসে। যদি একবার মুখ তুলে চায় ভাগ্যদেবতা।

অবশেষে সেই দিনটির সাক্ষাৎ পেলাম।আকস্মিকভাবেই পেলাম। ঘড়ির কাঁটায় তিনটা বাজবে বাজবে করেও বাজছে না। এমন সময় একটা কল এলো ফোনে। শুয়ে ছিলাম, তাই চোখ বন্ধ করেই রিসিভ করি। তখন চিকন একটা কণ্ঠস্বর বলে উঠল—‘হ্যালো, শিহাব বলছেন?’

‘হ্যাঁ, বলছি। ’ গলার মধ্যে হঠাৎ নারীকণ্ঠ শোনার মতো একটা আশ্চর্য ভাব ফুটে উঠেছে।

‘চিনতে পারছেন আমাকে?’ আরে, আজব তো! নিজে ফোন দিয়ে আমাকেই বলে কিনা তাকে চিনতে পারছি কিনা। কান থেকে ফোনটা নামিয়ে নম্বরটা দেখে নিলাম। না, এ নম্বর আমার অপরিচিত। তবু স্বীকার করলাম না। চিন্তা করার জন্য কিছুটা সময় নিলাম। এই কয়েক দিনে কাকে কাকে নম্বর দিয়েছি মনে করার চেষ্টা করছি। তবু কিছু কিনারা করতে পারলাম না।

‘চিনতে পারলেন না তো? জানতাম চিনবেন না। ’ ওপাশ থেকে বলা হলো।

‘কে? সন্ন্যাসী?’ কণ্ঠে সন্দেহ নিয়েই জিজ্ঞেস করলাম।

হাসছে কণ্ঠটা। ‘হুম্, আমি। চিনলেন কিভাবে?’

‘বুঝতে হবে। চিন্তা করে বের করবেন। ’

অত চিন্তা করার সময় নেই। তার পরের মিনিট পনেরো তুমুল আগ্রহে অনেক কথাই সে বলল। তার পরিবারের কথা, পছন্দের গানের কথা, ভালো লাগা রঙের গল্প—আরো কত কী!

কথাগুলো শুনতে বেশ লাগছিল, তাই শুধু শ্রোতার ভূমিকা পালন করে গেছি আমি। শেষে বলল, ‘আমার এক আত্মীয় ফোন দিয়েছে, আপনাকে রাতে ফোন দেব কেমন। ’ বলেই আকস্মিকভাবে ফোনটা রেখে দিল। খুব ভালো লাগছিল তখন। মনে হলো, যেন কত অমূল্য কিছু পেয়ে গেছি আমি।

সত্যিই আমি পেয়েছিলামও। সেদিন থেকে টানা তিন মাস আমাদের কথা চলছিল। মান-অভিমানও কম হয়নি। আবার মিটেও গেছে। এর মধ্যে হৃদয়ের কত আবেগ দেওয়া-নেওয়া হয়ে গেছে একটু একটু করে। ধীরে ধীরে আরো গাঢ় হয়েছে আমাদের প্রেম। একদিন কথা না বললে কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগত বুকটা। আজ সে আমার সামনে দাঁড়িয়ে—বিশ্বাসই হতে চায় না সেটা।

‘চুল ছিঁড়বে ঠিক আছে, তবে চারটাই কেন? তার কম বা বেশি কেন নয়?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করি।

সে মুখ তুলে তাকায়। তার দৃষ্টিতে কেমন একটা কালো পতাকা শূন্যতা নিয়ে মিছিলে নামল। বলল, ‘কারণ আছে। শুনবেনই তাহলে?’ তারপর বড় করে একটা দম নিল। দমের সঙ্গে সঙ্গে সাহসও নিল বুঝি কিছু।

‘মনে আছে, ফোনে একদিন রাগী গলায় কথা বলেছিলেন আমার সঙ্গে। সেটা শুনে সারা রাত খুব কেঁদেছিলাম আমি। রাতের খাবারটাও খাইনি দুঃখে। কাঁদার জন্য একটা, আরেকটা খাবার না খেতে দেওয়ার জন্য। ’

‘মোটে তো দুটো হলো। আর বাকি দুটো? সেটার কারণও শুনি। ’ কৌতুক মনে করে মুচকি মুচকি হাসছি। আমার চোখ থেকে তার চোখ নামিয়ে নিল সে। মাথা নিচু করে আছে।

‘কী হলো, বলবেন না?’ আমি তাগাদা দিলাম।

হঠাৎ দেখি, তার চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। ঘটনার আকস্মিকতায় বিমূঢ় হয়ে গেলাম। কী করব ঠিক বুঝতে পারছি না। তবে কি আনমনে তাকে কষ্ট দিয়ে ফেলেছি?

কিছুক্ষণ পর ও মুখ তুলল। কান্নায় চোখ জোড়া সিঁদুরের মতো লাল হয়ে গেছে। সত্য বলবে বলে হয়তো চোখে চোখ রাখে শ্রাবণী। তারপর নাক টেনে শক্ত গলায় বলল, ‘আমি শ্রাবণী নই। ওর যমজ বোন। আমার নাম লাবণী। আমাদের সব কিছু এক, কেবল কপালের কাছের এই দাগটা ছাড়া। ’ ঘোরের মধ্যে সে আঙুল দিয়ে তার কপালের দাগ দেখাল। ‘কলেজে পড়ার সময় বাথরুমে পড়ে এটা হয়েছে আমার। ’

‘তাহলে শ্রাবণী কোথায়?’

‘শ্রাবণী মারা গেছে। ’ বলেই সে উঠে দাঁড়াল।

‘মানে কী?’ আমিও উঠলাম। কথাটা শুনে মনে হলো, নিঃসঙ্গ কোনো বেনামি গ্রহের আকাশ ফুঁড়ে ধপ করে মাটিতে আছড়ে পড়লাম। হাড়গোড় সব চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে দলা পাকিয়ে গেছে। এটা কী শুনছি আমি! সৃষ্টিকর্তা কেন আমাকে এমন কষ্ট দিল।

পাথরের মতো নিঃশব্দে অশ্রু ঝরতে লাগল দুই চোখ ভেঙে। ভেতরের সাগরটিতে বুঝি জোয়ার এসেছে খুব।

‘আজ থেকে এক মাস আগে আত্মহত্যা করেছে ও। বিশ্বাস করুন, আপনাকে ও ঠকাতে চায়নি। ’

‘তবে আত্মহত্যা করল কেন?’ বাচ্চাদের মতো শব্দ করে ফুঁপিয়ে উঠলাম। বুকটা ফেটে চৌচির হয়ে গেছে আমার।

চন্দ্রাহতের মতো একের পর এক চাপড় মারছি বুকে।

লাবণী বলল, ‘বেশ কয়েক দিন ধরেই ওর বিয়ের কথা চলছিল। হঠাৎ এক পাত্রপক্ষ এসে পছন্দ করে সেই রাতেই বিয়ে করে নিয়ে গেল ওকে। তার পরের দিন বিকেলে তার লাশ পাওয়া যায় ঘরের তীরের সঙ্গে লটকানো অবস্থায়। এই কয়েক দিন ওর হয়ে আমি আপনার সঙ্গে কথা বলেছি। পারলে আমাকে মাফ করে দিয়েন। ’

তারপর সে আর কী বলেছে, সেটা কানে পৌঁছেনি। কোনো কিছু ভাবার মতো সময় ছিল না হাতে। টুকরো টুকরো করে গড়া এত দিনের স্বপ্নের পৃথিবীটা আমার চোখের অগোচরেই ভেঙে গেল।

এমনই দুর্ভাগ্য আমার, টেরও পেলাম না। হঠাৎ পাগলের মতো এক ভোঁ-দৌড় দিলাম। কোথায় যাব, তা জানি না। শুধু এটুকু জানি, আমাকে দৌড়াতে হবে। দৌড়াতে হবে অনন্তকালের দৌড়।

Googleplus Pint
Noyon Khan
Manager
Like - Dislike Votes 24 - Rating 5.4 of 10
Relatedআরও দেখুনঅন্যান্য ক্যাটাগরি
ভালোবাসার পুনর্বাসন ভালোবাসার পুনর্বাসন
Aug 29 at 9:26pm 1,290
ভালোবাসার মানুষ হয়ে ওঠার গল্প ভালোবাসার মানুষ হয়ে ওঠার গল্প
Aug 25 at 10:20pm 1,699
শেষ চিঠি শেষ চিঠি
Aug 19 at 9:56pm 1,663
স্বপ্নকে ছুঁয়ে দেখার অপেক্ষা স্বপ্নকে ছুঁয়ে দেখার অপেক্ষা
Aug 18 at 10:29pm 1,396
নাগরদোলা! নাগরদোলা!
Apr 16 at 10:00pm 2,081
ভালোবাসার কুটকুট! ভালোবাসার কুটকুট!
Feb 14 at 10:50pm 4,162
নস্টালজিয়া! নস্টালজিয়া!
Feb 12 at 11:38am 2,115
গল্প থেকে ভালোবাসায়! গল্প থেকে ভালোবাসায়!
Feb 11 at 11:22pm 4,266

পাঠকের মন্তব্য (0)

Recent Posts আরও দেখুন

লম্বা চুলের জন্য...
বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে হল্যান্ড-পিএনজি
ব্যাটিংয়ে শীর্ষে এনামুল
ফিফার বর্ষসেরা খেলোয়াড় রোনালদো!
জানেন কি, বলিউডের কোন গায়কের অনুরাগী কোহলি?
স্টেডিয়াম নয়, যেন পাড়া-গায়ের কোনো এক ধানখেতে খেলছে বাংলাদেশ!
রেসিপি: সুস্বাদু বাদামের হালুয়া
পিকেকে কথা কম বলতে বললেন মেসি